মটকা (Matka) মাটি থেকে তৈরি একপ্রকার বিশালাকৃতির পাত্র, যা দেখতে অনেকটা কলসের মতো মনে হয়। এজাতীয় পাত্রে সাধারণত চাল সংরক্ষণ করা হয়। তবে চাল ছাড়াও সরিষার তেল, আচার, গুড়, পাটালি, এমনকি বৃষ্টির পানি সংরক্ষণেও মটকা ব্যবহার হত। মাটির তৈরি শিল্পের একটি পণ্য মটকা, যা কুমাররা হাতে তৈরি করে থাকেন। এ শিল্পের সাথে আমাদের হাজার বছরের ইতিহাস জড়িত।
ঘরের এক কোণে মেঝেতে বসানো একটা বিশাল মাটির পাত্র। গায়ে হালকা কালচে রং, ঢাকনায় বাঁশের চাটাই। ওটার ভেতরে আছে বছরের চাল। ফ্রিজ নেই, প্লাস্টিক নেই – তবু চাল তাজা থাকে, পোকা ধরে না, গন্ধ বদলায় না। এটাই মটকার যাদু।
আরও: নৌকা
সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
| বাংলা নাম | মটকা |
| অন্য নাম | মটকি, বড় কলস, গুড়গুড়ি |
| ইংরেজি নাম | Matka / Earthen Storage Pot |
| উপাদান | এঁটেল মাটি (পোড়ামাটি) |
| তৈরি করেন | কুমার / পাল সম্প্রদায় |
| আকার | উচ্চতা ২–৫ ফুট |
| ধারণক্ষমতা | ৫০–১৩০ কেজি চাল |
| প্রধান ব্যবহার | চাল-ধান সংরক্ষণ |
ইতিহাস ও প্রাচীনত্ব
বাংলাদেশের মৃৎশিল্পের এক সমৃদ্ধ ঐতিহ্য রয়েছে। যুগ যুগ ধরে এ দেশে সে ঐতিহ্য লালন-পালন করে আসছে এ শিল্পের রূপকার কুমোর বা কুমার শ্রেণির পেশাজীবীরা। মাটির পাত্র ব্যবহারের ইতিহাস বাংলায় কয়েক হাজার বছর পুরনো। নরসিংদীর ওয়ারী বটেশ্বরে মাটি খুঁড়ে পাওয়া গেছে নানা ধরনের সুন্দর মাটির পাত্র ও ফলক। ময়নামতীর শালবন বিহার ও বগুড়ার মহাস্থানগড়েও প্রাচীন মাটির পাত্রের নিদর্শন আছে।
মটকা কেবল সাধারণ গৃহস্থালির পাত্র ছিল না, এর ব্যবহার ছিল স্থাপত্যেও। চট্টগ্রামের পাথরঘাটার নজুমিয়া লেইনে তিন’শো বছর আগে বিশেষ কায়দায় গড়ে তোলা একটি দ্বিতল ভবনের নিচে সারি সারি মাটির মটকা পাওয়া গেছে। তৎকালীন ইঞ্জিনিয়াররা ভূমিকম্প ও জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষা করতে ভবনের নিচে এ মাটির মটকা পদ্ধতি ব্যবহার করতেন বলে গবেষকদের ধারণা।
কুমারের চাকে তৈরি বিশালাকৃতির পোড়ামাটির এই পাত্রে একসময় বছরের ধান-চাল জমা থাকত। পোকা ধরত না, গন্ধ নষ্ট হত না, স্বাদ অটুট থাকত – আধুনিক বিজ্ঞান আজ যা প্রমাণ করছে, গ্রামবাংলা তা হাজার বছর আগেই জানত।
আরও: কুপিবাতি
গঠন
মৃৎশিল্প হলো বিশেষ এঁটেলমাটি বা কাদামাটি দিয়ে হাড়ি-পাতিল ও বিভিন্ন আসবাবপত্র তৈরি করার শিল্প, যাতে বস্তুগুলো টেকসই ও মজবুত করার জন্য উচ্চ তাপমাত্রায় পোড়ানো হয়। যারা মাটি দিয়ে বিভিন্ন জিনিসপত্র তৈরি করেন তাদেরকে কুম্ভকার বা চলিত বাংলায় কুমার বলা হয়।
মটকা তৈরিতে বিশেষ দক্ষতা লাগে – কারণ এটা সাধারণ হাঁড়ির চেয়ে অনেক বড়। কুমার প্রথমে এঁটেল মাটি জল দিয়ে মথে নরম করেন। তারপর চাকায় বসিয়ে ধীরে ধীরে উপরে তুলে আনেন। মটকার গলা সরু রাখা হয় – যাতে বায়ু চলাচল নিয়ন্ত্রিত থাকে। গলায় ঢাকনা দেওয়ার ব্যবস্থা থাকে। তৈরির পর ছায়ায় শুকিয়ে উচ্চ তাপমাত্রায় পোড়ানো হয় – এতেই মটকা পাকাপোক্ত ও দীর্ঘস্থায়ী হয়।
মটকার বৈজ্ঞানিক গুণাগুণ
মটকায় রাখা চালে সহজে পোকা ধরে না এবং চালের গন্ধ ও স্বাদ দীর্ঘদিন অটুট থাকে। তাছাড়া মাটি থেকে তৈরি বলে এজাতীয় পাত্রের সংস্পর্শে থাকার ফলে চালে কোনো ক্ষতিকারক উপাদান মিশে না।
কুমার সম্প্রদায়
মটকা তৈরির শিল্পী হলেন কুমার বা পাল সম্প্রদায়। বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় কুমারপাড়া আছে – রাজশাহী, দিনাজপুর, কুমিল্লা, সুনামগঞ্জ। এই মৃৎশিল্পিরা নিজ হাতে সামান্য মাটিকে বিভিন্ন চোখ ধাঁধানো পণ্যে রূপ দেন। মটকা তৈরি করা কুমারের সবচেয়ে কঠিন কাজ, বড় পাত্র যত বড়, চাকায় তোলা তত কঠিন।
মটকার চাহিদা কমে যাওয়ায় অনেক কুমার পরিবার এখন ছোট পাত্র বা সৌন্দর্যপণ্য তৈরিতে সরে গেছেন। মটকা বানানোর বিশেষ দক্ষতা এখন খুব কম কুমারের আছে।
মটকার পতনের পেছনে প্রধান কারণ প্লাস্টিক ড্রাম ও অ্যালুমিনিয়াম পাত্রের আগমন। ১৯৭০-৮০ দশকে সস্তা প্লাস্টিকের ড্রাম বাজারে এলে মানুষ সহজেই মটকার বিকল্প পেয়ে গেল – হালকা, সস্তা, বহনযোগ্য। মটকা ভারী, ভাঙলে ক্ষতি, সরানো কঠিন – এই অসুবিধাগুলো আগে মানুষ মেনে নিত, কারণ বিকল্প ছিল না। বিকল্প আসার পরেই মটকা দ্রুত সরে গেল।
আরও: একতারা
বর্তমান অবস্থা
পোড়া মাটির তৈরি মটকা প্রাচীন বাংলার মৃৎশিল্পের অনন্য দৃষ্টান্ত। আজকের বাংলাদেশে মটকা প্রায় বিলুপ্ত। তবে সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও হাওর অঞ্চলের কিছু পুরনো বাড়িতে পূর্বপুরুষের মটকা এখনো ব্যবহার হচ্ছে – বংশের স্মৃতি হিসেবে, কার্যকরী পণ্য হিসেবেও।
নতুনভাবে মটকা তৈরির কারিগর এখন বিরল। তবে আশার বিষয় – অর্গানিক ফুড আন্দোলনের প্রসারের সাথে মাটির পাত্রে খাবার সংরক্ষণের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। কিছু উদ্যোক্তা ছোট মটকা তৈরি করে “অর্গানিক স্টোরেজ” হিসেবে বিক্রি করছেন।
